ঢাকা | ২৯ জুলাই, ২০২৬ | ১৩ শ্রাবণ, ১৪৩৩

ঢাকা | ২৯ জুলাই, ২০২৬ | ১৩ শ্রাবণ, ১৪৩৩

স্টারমারের বিদায়ে ব্রেক্সিট পরবর্তী ব্রিটেন গভীর সংকটে

স্টারমারের বিদায়ে ব্রেক্সিট পরবর্তী ব্রিটেন গভীর সংকটে

স‍্যার কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগ ব্রিটিশ রাজনীতিতে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছে। তবে এটিকে শুধু একজন প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে বৃহত্তর বাস্তবতা অনেকটাই অদৃশ্য থেকে যাবে। স্টারমারের বিদায় আসলে ব্রেক্সিট-পরবর্তী ব্রিটেনের অমীমাংসিত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটেরই একটি স্পষ্ট প্রতিফলন।

২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসেন স্টারমার। দীর্ঘ ১৪ বছরের কনজারভেটিভ শাসনের পর ভোটাররা তার মধ্যে স্থিতিশীলতা, জবাবদিহিতা ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের আশা দেখেছিলেন। কিন্তু দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে সেই আশা হতাশায় পরিণত হয়। দলীয় চাপ, স্থানীয় নির্বাচনে বিপর্যয় এবং নেতৃত্ব সংকটের মুখে তাকে পদত্যাগের ঘোষণা দিতে হয়েছে।

অর্থনৈতিক চাপ ও জনঅসন্তোষ
গত কয়েক বছর ধরে ব্রিটেন জীবনযাত্রার ব্যয়ের তীব্র বৃদ্ধি, আবাসন সংকট, ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং এনএইচএসসহ সরকারি সেবার উপর ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে রয়েছে। অনেক সাধারণ নাগরিকের মতে, সরকার বদল হলেও দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতা খুব বেশি বদলায়নি। সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচন ও উপনির্বাচনের ফলাফলে এই অসন্তোষ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
 
ব্রেক্সিট-পরবর্তী দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা
স্টারমারের পদত্যাগের পেছনে শুধু অর্থনীতি নয়, ব্রেক্সিট-পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতাও বড় ভূমিকা রেখেছে। ২০১৬ সালের গণভোটের পর থেকে এখন পর্যন্ত দেশটিতে ছয়জন প্রধানমন্ত্রী বদল হয়েছে-ডেভিড ক্যামেরন, থেরেসা মে, বরিস জনসন, লিজ ট্রাস, ঋষি সুনাক এবং কিয়ার স্টারমার। প্রত্যেকের নেতৃত্বেই কোনো না কোনো পর্যায়ে জনআস্থার সংকট দেখা দিয়েছে। এই ধারাবাহিক নেতৃত্ব পরিবর্তন একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলেছে: সমস্যাটি কি শুধু ব্যক্তিগত নেতৃত্বের, নাকি ব্রিটিশ রাজনৈতিক ব্যবস্থার গভীর কাঠামোগত?
 
পশ্চিমা গণতন্ত্রের আস্থা সংকট
আধুনিক ব্রিটেনে ভোটারদের প্রত্যাশা দ্রুত বদলাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ২৪ ঘণ্টার সংবাদচক্র মানুষের ধৈর্য কমিয়ে দিয়েছে। অর্থনীতি, স্বাস্থ্যসেবা ও অভিবাসনের মতো জটিল সমস্যার সমাধান সময়সাপেক্ষ। ফলে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ব্যবধান ক্রমাগত বেড়েছে। ইউরোপজুড়েই এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস ও ইতালিতে ঐতিহ্যবাহী দলগুলোর প্রতি জনআস্থা কমছে, আর জনতাবাদী শক্তিগুলো নতুন সমর্থন পাচ্ছে। ব্রিটেনও এই বৃহত্তর পশ্চিমা রাজনৈতিক সংকট থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।
 
আন্তর্জাতিক প্রভাব
স্টারমারের বিদায়ের আন্তর্জাতিক তাৎপর্যও কম নয়। চলমান ইউক্রেন যুদ্ধ, ন্যাটোর ভবিষ্যৎ, চীনের উত্থান এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের মধ্যে ব্রিটেন পশ্চিমা জোটের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। নেতৃত্ব পরিবর্তন পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকারে সূক্ষ্ম পরিবর্তন আনতে পারে,বিশেষ করে ইইউ-সম্পর্ক, প্রতিরক্ষা ব্যয় ও বাণিজ্যিক পুনর্গঠনে।
 
নতুন নেতৃত্বের প্রশ্ন
এখন আলোচনার কেন্দ্রে লেবার পার্টির নতুন নেতৃত্ব। সাবেক ম্যানচেস্টার মেয়র অ্যান্ডি বার্নহামকে অনেকেই এগিয়ে রাখছেন। তবে আসল প্রশ্ন ব্যক্তি নয়-নতুন নেতা কি গত এক দশকে ক্ষয় হওয়া জনআস্থা ফিরিয়ে আনতে পারবেন? তিনি কি বিভক্ত সমাজকে একত্রিত করার মতো সমন্বিত রাজনৈতিক ভাষা ও অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা দিতে সক্ষম হবেন?
 
কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগ শুধু একজন প্রধানমন্ত্রীর বিদায় নয়। এটি ব্রেক্সিট-পরবর্তী ব্রিটেনের পরিচয় সংকট ও দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার প্রতিফলন। দেশটি এখনও নিজের নতুন অর্থনৈতিক মডেল ও বৈশ্বিক ভূমিকা পুরোপুরি নির্ধারণ করতে পারেনি। নতুন নেতা আসবেন, নতুন প্রতিশ্রুতি দেয়া হবে। কিন্তু ব্রিটেনের প্রকৃত চ্যালেঞ্জ একই থেকে যাবে-অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক প্রভাবের মধ্যে টেকসই ভারসাম্য খুঁজে পাওয়া। স্টারমারের বিদায় সেই প্রশ্নের উত্তর দেয়নি, বরং প্রশ্নটিকে আরও তীক্ষ্ণ ও জরুরি করে তুলেছে।
 
লেখক : যুক্তরাজ‍্য প্রবাসী আইনবিদ, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক     # সূত্র : সময়

আমাদের অংশীজন