বিশ্ব একটি শক্তিশালী এল নিনোর মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক আবহাওয়া ও জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক পূর্বাভাস বলছে, ২০২৬-২৭ সালের এল নিনো চলতি শতাব্দীর অন্যতম শক্তিশালী বা ‘সুপার এল নিনো’ হতে পারে। এটি কেবল একটি আবহাওয়াগত ঘটনা নয়; বরং বৈশ্বিক কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও অর্থনীতির জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।
এল নিনোর প্রভাব পৃথিবীর সব অঞ্চলে এক রকম হয় না। কোথাও দীর্ঘস্থায়ী খরা, কোথাও অতিবৃষ্টি ও বন্যা, আবার কোথাও তাপপ্রবাহ। যা কৃষি উৎপাদনকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বিশ্বের খাদ্য চাহিদার বড় অংশ আসে গম, ধান, ভুট্টা ও সয়াবিনের মতো কয়েকটি প্রধান ফসল থেকে। এল নিনোর কারণে ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া কিংবা আর্জেন্টিনার মতো উৎপাদনকারী দেশগুলোতে ফলন কমে যাবে। এর প্রভাব শুধু ওই দেশেই সীমাবদ্ধ থাকবে না না। আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যের দাম বেড়ে যাবে। আমদানিনির্ভর দেশগুলো সংকটে পড়বে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খাদ্যপ্রাপ্তি কঠিন হয়ে ওঠবে।
বিশ্ব কৃষি ইতোমধ্যেই নানা চাপে রয়েছে। সার ও জ্বালানির উচ্চ মূল্য। সরবরাহ ব্যবস্থার অস্থিরতা। যুদ্ধজনিত বাণিজ্য বিঘ্ন। জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব। যা কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। এর সঙ্গে যদি এলনিনোর কারনে ব্যাপক খরা বা বন্যা হয়, তাহলে কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য সরবরাহে বহুমাত্রিক সংকট তৈরি হতে পারে।
আফ্রিকার বহু দেশ বৃষ্টি-নির্ভর কৃষির ওপর নির্ভরশীল। সেখানে খরা খাদ্য সংকট ও অপুষ্টি বাড়াতে পারে। অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ায় দুর্বল মৌসুমি বৃষ্টিপাত ধান উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে খরা ও দাবানলের ঝুঁকি বাড়বে। আবার যুক্তরাষ্ট্র ও কিছু অঞ্চলে অতিবৃষ্টির কারণে কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অর্থাৎ, বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ কৃষি অঞ্চলগুলোর প্রায় সবকটিই কোনও না কোনোভাবে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
এল নিনোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব। খাদ্য উৎপাদন কমে গেলে মূল্যস্ফীতি বাড়ে। কৃষকের আয় কমে যায়। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পায়। ইতিহাস দেখিয়েছে, খাদ্য সংকট অনেক সময় সামাজিক অস্থিরতা ও রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণও হতে পারে। ফলে এল নিনোকে শুধু কৃষির সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একটি বহুমাত্রিক উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ।
তবে আশার কথা হলো, আধুনিক প্রযুক্তি এখন কয়েক মাস আগেই এল নিনোর সম্ভাবনা শনাক্ত করতে সক্ষম। স্যাটেলাইট, সমুদ্র পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা ও উন্নত জলবায়ু মডেল ব্যবহার করে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব। খরা-সহনশীল ও স্বল্পমেয়াদী জাতের ব্যবহার, পানি ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, কৃষি বীমা সম্প্রসারণ, খাদ্য মজুত বৃদ্ধি এবং কৃষকদের সময়োপযোগী তথ্য সরবরাহের মাধ্যমে সম্ভাব্য ক্ষতি অনেকাংশে কমানো যেতে পারে।
বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক-সংকেত। যদিও এল নিনোর প্রভাব সরাসরি সব সময় একই রকম হয় না। তবু বৈশ্বিক অস্থিরতা, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা দেশের কৃষি ও অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই জাতীয় পর্যায়ে আগাম পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির বিকল্প নেই।
সুপার এল নিনো যদি সত্যিই শক্তিশালী রূপ নিয়ে আসে, তাহলে তার অভিঘাত শুধু আবহাওয়ায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি বিশ্ব খাদ্য-ব্যবস্থা, কৃষকের জীবিকা এবং কোটি কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করবে। তাই এটিকে ভবিষ্যতের সংকট হিসেবে নয়, বরং বর্তমানের প্রস্তুতির বিষয় হিসেবে দেখা প্রয়োজন। সময়মতো সঠিক পদক্ষেপই পারে সম্ভাব্য বিপর্যয়ের ক্ষতি কমিয়ে আনতে।



