ঢাকা | ২৯ জুলাই, ২০২৬ | ১৩ শ্রাবণ, ১৪৩৩

ঢাকা | ২৯ জুলাই, ২০২৬ | ১৩ শ্রাবণ, ১৪৩৩

‘ককরোচ’ তরুণদের ক্ষোভের ভাষার পরীক্ষা ভারতের

‘ককরোচ’ তরুণদের ক্ষোভের ভাষার পরীক্ষা ভারতের

কোনো আন্দোলন কখনোই শূন্য থেকে জন্ম নেয় না। তার পেছনে থাকে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, বঞ্চনা, অনিশ্চয়তা এবং আস্থাহীনতার ইতিহাস। ভারতে চলমান ‘ককরোচ’ আন্দোলনও তেমনই একটি বাস্তবতার বহিঃপ্রকাশ। প্রথমে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে শুরু হলেও এটি এখন শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সুশাসন ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহির প্রশ্নে তরুণ সমাজের একটি বৃহত্তর প্রতিবাদে পরিণত হয়েছে।

ভারতের জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন ভর্তি পরীক্ষা, বিশেষ করে চিকিৎসাশাস্ত্রে ভর্তির জন্য অনুষ্ঠিত নিট পরীক্ষায় অনিয়ম ও প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ লাখো শিক্ষার্থীর মনে গভীর ক্ষোভের জন্ম দেয়। বহু বছরের পরিশ্রম, অর্থনৈতিক ত্যাগ এবং স্বপ্ন মুহূর্তেই অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ছিল, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে মেধার মূল্যায়নের পুরো প্রক্রিয়াই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে গেছে। একটি রাষ্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হলে তার অভিঘাত শুধু শ্রেণিকক্ষ বা পরীক্ষার হল পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে না; তা গোটা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিশ্বাসযোগ্যতাকেও নাড়িয়ে দেয়।

এই পরিস্থিতিতে একটি বিতর্কিত মন্তব্য আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। বিক্ষুব্ধ তরুণদের উদ্দেশে ব্যবহৃত "ককরোচ" শব্দটিকে তারা অপমান হিসেবে গ্রহণ না করে প্রতিবাদের প্রতীকে রূপ দেয়। ইতিহাসে এমন ঘটনা বিরল নয়। যে শব্দ দিয়ে মানুষকে ছোট করা হয়, অনেক সময় সেই শব্দই প্রতিবাদের সবচেয়ে শক্তিশালী পরিচয়ে পরিণত হয়। "ককরোচ জনতা পার্টি" বা CJP-এর উত্থান তারই উদাহরণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হওয়া ব্যঙ্গাত্মক উদ্যোগ অল্প সময়ের মধ্যেই বাস্তবের একটি সংগঠিত আন্দোলনে রূপ নেয়।

তবে আন্দোলনের প্রকৃত শক্তি কোনো নাম বা প্রতীকে নয়; বরং এর দাবিতে। প্রশ্নফাঁসের বিচার, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার, সরকারি নিয়োগে স্বচ্ছতা এবং তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ—এসব দাবিই আজ ভারতের লাখো তরুণের কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। তাদের বক্তব্য, সমস্যা কেবল একটি পরীক্ষা নয়; বরং এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে যোগ্যতার চেয়ে অনিয়ম অনেক সময় বেশি প্রভাবশালী হয়ে ওঠে।

সরকারও বিষয়টির গুরুত্ব অস্বীকার করছে না। প্রশ্নফাঁস রোধে কঠোর আইন, দ্রুত বিচার এবং প্রশাসনিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ পরিস্থিতিতে সরকার ও আন্দোলনের প্রতিনিধিদের মধ্যে সংলাপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সময়ে আন্দোলনকারীরা দেশজুড়ে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে। সংলাপ ও আন্দোলন—দুই প্রক্রিয়া সমান্তরালে চলার এই চিত্রই বলে দেয়, আস্থার সংকট এখনো পুরোপুরি কাটেনি।

গণতন্ত্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। আবার জনশৃঙ্খলা বজায় রাখাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিবাদ দমনে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ যেমন পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে, তেমনি আন্দোলনও যদি অহিংস অবস্থান থেকে সরে যায়, তবে তার নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই সংকটের সমাধান শক্তি প্রদর্শনে নয়, বরং সংলাপ, স্বচ্ছতা এবং বিশ্বাস পুনর্গঠনের মধ্যেই নিহিত।

ভারতের এই আন্দোলন শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঘটনা নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। এই অঞ্চলের প্রায় সব দেশেই তরুণ জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বড় জনশক্তি। কিন্তু শিক্ষা শেষ করে কর্মসংস্থান না পাওয়া, নিয়োগে অনিয়ম, পরীক্ষা নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং দুর্নীতির অভিযোগ যদি ক্রমাগত বাড়তে থাকে, তবে সামাজিক অসন্তোষও বাড়বে। উন্নয়নের সুফল তখন মানুষের কাছে অর্থহীন হয়ে পড়বে।

বাংলাদেশের জন্যও এখানে শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। আমাদের দেশেও বিভিন্ন সময়ে প্রশ্নফাঁস, নিয়োগে অনিয়ম এবং তরুণদের কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ দেখা গেছে। তাই এখনই শিক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, পরীক্ষার নিরাপত্তা জোরদার করা, সরকারি নিয়োগে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা এবং তরুণদের জন্য বাস্তবসম্মত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা জরুরি। সংকট তৈরি হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে আগেই প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ নেওয়া অনেক বেশি কার্যকর।

রাষ্ট্রের শক্তি তার প্রশাসনিক ক্ষমতায় নয়; বরং নাগরিকের আস্থায়। তরুণদের বিশ্বাস হারালে কোনো রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল থাকতে পারে না। আজকের শিক্ষার্থীই আগামী দিনের চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, উদ্যোক্তা, প্রশাসক ও নীতিনির্ধারক। তাদের হতাশা একটি দেশের ভবিষ্যৎকেই অনিশ্চিত করে তোলে।

‘ককরোচ’ আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটিই—তরুণদের কণ্ঠস্বরকে অবজ্ঞা করার সুযোগ নেই। তাদের অভিযোগ যদি যুক্তিসংগত হয়, তবে তা শোনা, মূল্যায়ন করা এবং সমাধানের পথ খুঁজে বের করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অন্যদিকে, গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনই যে দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তনের সবচেয়ে কার্যকর পথ, সেটিও আন্দোলনকারীদের মনে রাখতে হবে।

আজ ভারতের সামনে শুধু একটি আন্দোলন থামানোর চ্যালেঞ্জ নয়; বরং তরুণ সমাজের আস্থা পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ। এই পরীক্ষায় সফল হতে পারলে তা হবে শুধু একটি সরকারের সাফল্য নয়, গণতন্ত্রেরও সাফল্য। আর ব্যর্থ হলে ‘ককরোচ’ আন্দোলন ইতিহাসে কেবল একটি প্রতিবাদের নাম হয়ে থাকবে না; এটি হয়ে উঠবে রাষ্ট্র ও তরুণদের মধ্যকার গভীর বিচ্ছিন্নতার প্রতীক।

আমাদের অংশীজন