মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হওয়ায় বুধবার বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই বাজারে এ অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। খবর দিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপি।
একই সময়ে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারেও অস্থিরতার ছাপ পড়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি খাতে ব্যাপক বিনিয়োগের সাফল্য নিয়ে সংশয় বাড়ায় সংশ্লিষ্ট চিপ নির্মাতা কোম্পানিগুলোর শেয়ারদর ক্রমাগত নিম্নমুখী রয়েছে। এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের আসন্ন সুদহার সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের দিকেও নজর রাখছেন বিনিয়োগকারীরা—অনেকের ধারণা, সংস্থাটি কঠোর অবস্থান নিতে পারে।
তেলের বাজারে এই উত্তাল পরিস্থিতির সূত্রপাত ঘটে মঙ্গলবার, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের যুদ্ধবিমান ইরাকে অবস্থানরত ইরান-সমর্থিত একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর ওপর হামলা চালায়। মার্কিন সামরিক বাহিনীর ভাষ্যমতে, ওই গোষ্ঠী সাম্প্রতিক সময়ে দুই ডজনেরও বেশি ড্রোন হামলা পরিচালনা করেছিল।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড (আইআরজিসি)-এর নির্দেশে পরিচালিত এই গোষ্ঠী মার্কিন সেনা ও সৌদি জ্বালানি স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনা করেছিল বলেই তাদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়। এর আগেও তেহরান থেকে ছোড়া একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার কথা জানিয়েছিল সেন্টকম।
এদিকে বুধবার ইরান জানায়, তারা হরমুজ প্রণালীতে তিনটি তেলবাহী জাহাজ আটকে দিয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশই এই নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যে তিন দিনের একটি সাময়িক বিরতির পর নতুন করে এই উত্তেজনা দেখা দিল। এই বিরতির আগে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোকে লক্ষ্য করে বারবার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছিল ইরান।
বাজার পরিসংখ্যান বলছে, বুধবার প্রধান দুই ধরনের অপরিশোধিত তেলের দরই ৪ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এ মাসে ব্রেন্ট ক্রুডের দামে ব্যাপক ওঠানামা লক্ষ্য করা গেছে—জুলাইয়ের শুরুতে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭২ ডলার থাকলেও গত সপ্তাহে তা ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়, এরপর সাময়িক বিরতির সময় দাম কিছুটা নিম্নমুখী হয়েছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি একটি চুক্তির ‘সম্ভাবনা’ থাকার কথা বললেও পরিস্থিতি দেখে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা কতটা ভঙ্গুর, তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে প্রযুক্তি খাতেও বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগ সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানগুলো প্রত্যাশিত ফল দিতে পারবে কি না—এ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সংশয় ক্রমেই বাড়ছে। বিষয়টি আরও ঘনীভূত হয়েছে প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম দ্য ইনফরমেশনের একটি প্রতিবেদনে, যেখানে বলা হয়েছে চীনের সাংহাই ইউলিয়াংশেং একটি অত্যাধুনিক চিপ-প্রযুক্তির ব্যাপক উৎপাদন শুরু করেছে, যে প্রযুক্তিতে দীর্ঘদিন ধরে একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল নেদারল্যান্ডসের এএসএমএল কোম্পানির।
এই প্রতিবেদনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ারবাজার। দেশটির প্রধান সূচক কসপি ৬ শতাংশের বেশি পড়ে গেছে। চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এসকে হাইনিক্স ও স্যামসাংয়ের শেয়ারদর কমেছে যথাক্রমে ১০ শতাংশ ও ৬ শতাংশ।
এসকে হাইনিক্সের এই দরপতনের পেছনে মূল কারণ এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে প্রতিষ্ঠানের পরিচালন মুনাফা ও রাজস্ব প্রত্যাশা অনুযায়ী না হওয়া—যদিও একই সময়ে কোম্পানিটির নিট মুনাফা বৃদ্ধি পেয়েছে চমকপ্রদ ১ হাজার ২৪২ শতাংশ। মাত্র এক মাস আগে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছানো এই শেয়ারের দাম এরই মধ্যে ৫০ শতাংশের বেশি কমে গেছে। উল্লেখ্য, এনভিডিয়ার জন্য হাই-ব্যান্ডউইডথ মেমোরি চিপের অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী এসকে হাইনিক্স দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত।
ত/জু



