শিশুদের অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষাকে পুঁজি করে দেশি-বিদেশি এনজিওগুলোর বিরুদ্ধে বিপুল অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে সরকারি এই অবৈতনিক শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত করতে এসব সংস্থা নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে বলে দাবি করেছেন বিশিষ্ট শিশুশিক্ষা গবেষক ও বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. সিদ্দিকুর রহমান।
তিনি উল্লেখ করেন, শিশুদের শিক্ষাকে কেন্দ্র করে এনজিওগুলো বিদেশি উৎস থেকে মোটা অঙ্কের তহবিল সংগ্রহ করে থাকে। তবে এ দেশের প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক হওয়ায় তাদের এ অর্থ প্রাপ্তিতে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। আর সে কারণেই এনজিওগুলো শিক্ষাব্যবস্থাকে সমৃদ্ধ করার পরিবর্তে একে রাষ্ট্র ও জনগণের কাছে বিতর্কিত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে।
বিবৃতিতে তিনি আরো জানান, স্বাধীনতার উষালগ্নে প্রাথমিক শিক্ষা সরকারিকরণ হওয়ার পর থেকে তারা সরকারের অভ্যন্তরে থেকে ষড়যন্ত্র চালাতে থাকে। ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের অভ্যন্তরে থেকে প্রাথমিক শিক্ষকদের তখনকার নিজ নিজ থানার বাইরে বদলি করার আদেশ জারি করে। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল, স্বল্প বেতনের প্রাথমিক শিক্ষকদের থানার বাইরে বদলি করে প্রাথমিক শিক্ষা ও শিক্ষকদের বিপর্যস্ত করে জাতীয়করণ হওয়া প্রাথমিক শিক্ষার সুনাম নষ্ট করা।
বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি হাইকোর্টে রিট করে সে ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দেয়। কিন্তু ১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দে সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা মিউনিসিপ্যালিটি তথা স্থানীয় সরকারের কাছে হস্তান্তর আইন জাতীয় সংসদে পাস করে প্রাথমিক শিক্ষাকে বেসরকারিকরণ করা হয়। তৎকালীন বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির নেতৃত্বে ৩ মাস ৬ দিন প্রাথমিক শিক্ষকরা ধর্মঘট করে সে বেসরকারিকরণ থেকে অব্যাহতি পান।
প্রয়াত প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সরকারের আমলে প্রাথমিক শিক্ষা উপজেলা পরিষদের কাছে নিয়োগ, বদলি, শাস্তিসহ সকল ক্ষমতা অর্পণ করে নিয়োগ, বদলি বাণিজ্যসহ প্রাথমিক শিক্ষা চরম বেহাল অবস্থায় পতিত হয়। বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির নেতৃত্বে সে বেহাল অবস্থা থেকে পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসে। সেনাসমর্থিত সরকারের আমলে প্রাথমিক শিক্ষাকে ব্যারাকের অধীনে হস্তান্তর করার আদেশ জারি করা হয়েছিল। সে সময়ও প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির আন্দোলনের মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা এনজিওর হাত থেকে রক্ষা পায়। তারপর আওয়ামী সরকারে শাসনামলে বিতরিক্ত প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেনের সময় থেকে এনজিওগুলো পরিপূর্ণভাবে প্রাথমিক শিক্ষায় জেঁকে বসে। সে অবস্থা থেকে আজও প্রাথমিক শিক্ষা মুক্ত হতে পারেনি।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে প্রাথমিক শিক্ষা ছিল পুরো এনজিও পরিবেষ্টিত। এনজিও ব্যক্তিত্ব ড. মনজুর আহমেদের নেতৃত্বে বেশির ভাগ এনজিও প্রতিনিধিদের নেতৃত্বে গঠিত হয় প্রাথমিক শিক্ষার জন্য কনসালটেশন কমিটি। একজন মানসিক রোগীর ডাক্তারকে করা হয় প্রাথমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা। স্বাধীনতার পর প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন থেকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ডা. বিধান চন্দ্র রায় পোদ্দারের সময়ে প্রাথমিক শিক্ষা ধ্বংসের শেষ প্রান্তে পৌঁছে। প্রাথমিক শিক্ষা এনজিওকরণ, চরম দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনায় পৌঁছে। প্রাথমিক শিক্ষকদের আন্দোলনে তারা শুধু আশ্বাসের ভাঁওতাবাজি করে সময়ক্ষেপণ করেছিল। এনজিওগুলোর দিকনির্দেশনায় প্রাথমিক শিক্ষকদের ১৩তম গ্রেড, প্রধান শিক্ষকদের দশম গ্রেড রিটের রায়কে আপিল বিভাগ পর্যন্ত নিয়ে এসে সময়ক্ষেপণ, সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতির মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি না করে সময়ক্ষেপণ, শতভাগ প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি, গরিব মানুষের সন্তানদের অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত ও সমৃদ্ধ না করে বন্ধ করার আদেশ জারিসহ বেসরকারি শিশু শিক্ষাকে পৃষ্ঠপোষকতা করে প্রাথমিক শিক্ষাকে সমূলে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়।
এনজিও ‘রুম টু রিড’-এর ডিরেক্টর রাখী সরকার আওয়ামী লীগ আমলে প্রাথমিক শিক্ষায় পাঠ্যবইয়ের রিডিং স্কিল বৃদ্ধির প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির জন্য তাদের কিছু বইকে রিডিং স্কিল বাড়াতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে গেছেন। এতে শিক্ষার্থীর মূল পাঠ্যবইয়ের রিডিং স্কিল বা শিখন ঘাটতি সৃষ্টি হয়।
‘প্লান বাংলাদেশ’-এর ডিরেক্টর কবিতা ঘোষ, ‘সেভ দ্য চিলড্রেন’-এর ডিরেক্টর সুমন সেনগুপ্ত, রুম টু রিডের ডিরেক্টর রাখী সরকার একটি বিশেষ দেশের প্রতিনিধি হিসেবে দেশের অভ্যন্তরে শিশু শিক্ষার ক্ষতি করে যাচ্ছেন। সবচেয়ে বৃহৎ এনজিও ব্র্যাক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষাকে নাস্তানাবুদ করে তাদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য দীর্ঘ সময় থেকে ষড়যন্ত্র করে আসছে। অথচ পতিত আওয়ামী লীগ সরকারসহ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মতো বর্তমান সরকারের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ এনজিও সিন্ডিকেটের পরামর্শে সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা চালানোর কথা ঘোষণা করেছেন। এনজিওগুলোর সরকারি প্রাথমিক শিক্ষার ন্যূনতম অভিজ্ঞতা না থাকলেও সরকারি প্রাথমিক শিক্ষাকে বিপর্যস্ত করার কূটকৌশলের অভিজ্ঞতা রয়েছে।