জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা ও নিয়মিত বন্যার মুখোমুখি হয়ে আসছেন। এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগে বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তাদের ঘরবাড়ি ও জীবিকা। এই বাস্তবতায় উপকূলবাসীর জীবনকে টেকসই ও সহনশীল করে তুলতে কাজ করছে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)।
পিকেএসএফ-এর “Resilient Homestead and Livelihood” (RHL) প্রকল্পের আওতায় দেশের সাতটি উপকূলীয় জেলার ২০টি উপজেলায় নানামুখী উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য একদিকে যেমন প্রাকৃতিক দুর্যোগ সহনশীল বাসস্থান নিশ্চিত করা, তেমনি বিকল্প ও টেকসই জীবিকার সংস্থান করা।
প্রকল্পের অন্যতম প্রধান কার্যক্রম হলো উঁচু ভিটায় জলবায়ু-সহনশীল ঘর নির্মাণ। জলোচ্ছ্বাস ও বন্যার পানি থেকে রক্ষা পেতে মাটি উঁচু করে টেকসই কাঠামোয় ঘর তৈরি করা হচ্ছে, যা দুর্যোগকালীন সময়ে পরিবারগুলোকে নিরাপদ আশ্রয় দিচ্ছে। পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানির সংকট মোকাবিলায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থাও গড়ে তোলা হচ্ছে, যা লবণাক্ততাপ্রবণ এলাকায় বিশেষভাবে কার্যকর হচ্ছে।
বিদ্যুৎ সুবিধাবঞ্চিত ও দুর্গম এলাকাগুলোতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে, যা পরিবেশবান্ধব ও টেকসই জ্বালানির উৎস হিসেবে কাজ করছে। এর পাশাপাশি জীবিকা নির্বাহের ক্ষেত্রেও বৈচিত্র্য আনা হয়েছে। বসতভিটার আশপাশে সবজি ও ফল চাষের মাধ্যমে পরিবারগুলো নিজেদের পুষ্টি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বাড়তি আয়ের সুযোগ পাচ্ছে।
লবণাক্ত মাটিতে সরাসরি চাষাবাদ কঠিন হওয়ায় উদ্ভাবনী পদ্ধতি হিসেবে বস্তায় আদা চাষ জনপ্রিয়তা পাচ্ছে উপকূলীয় এলাকায়। এছাড়া বন্যাপ্রবণ অঞ্চলে মাচায় ছাগল পালন পদ্ধতিও গ্রহণ করছেন অনেক পরিবার, যা পশুসম্পদকে দুর্যোগের সময় নিরাপদ রাখতে সহায়তা করছে। উপকূলীয় নদী ও খাল-বিলের সহজলভ্যতাকে কাজে লাগিয়ে অনেকে কাঁকড়া চাষেও যুক্ত হচ্ছেন, যা তুলনামূলক কম বিনিয়োগে লাভজনক জীবিকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আগে প্রতিটি দুর্যোগের পর তাদের নতুন করে সব শুরু করতে হতো। কিন্তু পিকেএসএফ-এর এসব উদ্যোগের ফলে এখন তারা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ আশ্রয়ে বসবাস করছেন এবং বিকল্প আয়ের উৎস থাকায় দুর্যোগ-পরবর্তী সময়েও জীবিকা সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ক্রমেই তীব্র হচ্ছে এবং উপকূলীয় অঞ্চল এই ঝুঁকির সম্মুখসারিতে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পিকেএসএফ-এর মতো সমন্বিত ও স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে উপকূলবাসীর জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।
ত/জু



