শীতের মিষ্টি স্বাদে গাছিদের শ্রমের গল্প

শীত মানেই খেজুরের রস আর নতুন গুড়ের ঘ্রাণ। কুয়াশা মাখা ভোরে খেজুর গাছে ওঠেন গাছিরা, আর তাঁদের রাতভর পরিশ্রমের ফল হয়ে ঘরে ঘরে পৌঁছায় মিষ্টি রস ও সুগন্ধি গুড়। তবে এই ঐতিহ্যবাহী স্বাদের পেছনে রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ, দক্ষতা ও নিরলস পরিশ্রম।

শীতের শুরুতেই গাছিরা খেজুর গাছ পরিষ্কার ও ছাঁটাই করে রস সংগ্রহের উপযোগী করেন। দিনে হালকা গরম, রাতে ঠান্ডা ও ভোরের কুয়াশা রসের মিষ্টতা বাড়ায়; তাই এ সময়টিই রস আহরণ ও গুড় তৈরির সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।

ভোরের আগেই গাছিরা খেজুর গাছে ওঠেন, গাছের শুকনো অংশ ছাঁটাই করে বুক চিরে নলি লাগান এবং মাটির হাঁড়ি বেঁধে দেন। সারারাত ফোঁটায় ফোঁটায় রস জমে সেই হাঁড়িতে।

গাছ কাটা, রস সংগ্রহ ও গাছে ওঠানামা—প্রতিটি কাজেই দরকার বিশেষ দক্ষতা ও শারীরিক পরিশ্রম। ভেজা ও উঁচু গাছে ওঠার সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকিও থাকে।

সংগৃহীত রস বড় কড়াইয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্বাল দিয়ে তৈরি হয় নলেন গুড়, পাটালি ও ঝোলা গুড়। এই কাজে সময় ও তাপমাত্রার সূক্ষ্ম হিসাব না রাখলে গুড়ের রং, গন্ধ ও স্বাদ নষ্ট হতে পারে।

অনেক পরিবারে নারীরাই রস জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরির কঠিন কাজটি করেন। এই গুড় বছরজুড়ে পিঠা, পায়েস ও নানা মিষ্টান্ন তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।

খেজুরের রস ও গুড় শুধু শীতের খাবার নয়; এটি হাজারো গাছি ও চাষি পরিবারের জীবিকার উৎস। চুয়াডাঙ্গায় এ পেশার সঙ্গে প্রায় ১৪-১৫ হাজার গাছি জড়িত এবং একজন শ্রমিক দৈনিক ২৫ থেকে ৩০টি গাছ কাটেন।

রাজশাহীতে একটি খেজুর গাছ থেকে মৌসুমে প্রায় ২০-২৫ লিটার রস পাওয়া যায়, যা থেকে প্রায় ১০ কেজি গুড় তৈরি হতে পারে। এই মৌসুমি ব্যবসা শীতে গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

খেজুর গাছ কমে যাওয়া, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, মধ্যস্বত্বভোগীর নিয়ন্ত্রণ এবং ন্যায্য মূল্য না পাওয়া এই পেশার বড় চ্যালেঞ্জ। ফলে অনেক গাছি পরিশ্রমের তুলনায় পর্যাপ্ত লাভ পান না এবং নতুন প্রজন্মও এ পেশায় আগ্রহ হারাচ্ছে।

তাই গাছিদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা, ভেজালমুক্ত গুড়ের বাজার গড়া, জ্বালানি সহায়তা দেওয়া এবং রস-গুড়ের ব্র্যান্ডিং ও রপ্তানির সুযোগ তৈরি করা জরুরি। শীতের পায়েস, পিঠা ও পাটালির স্বাদ উপভোগ করার সময় এই শ্রমিকদের কথাটাও মনে রাখা উচিত।

ত/জু

ফেসবুকে যুক্ত থাকুন