হামের ঝুঁকি থেকে শিশুকে বাঁচাবে টিকা

বাংলাদেশে বাড়ছে হামের সংক্রমণ; ইউনিসেফের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ: লক্ষণ, প্রতিরোধ ও যত্নের উপায়। বাংলাদেশে সম্প্রতি হামের সংক্রমণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ৬৭৬ জনের হাম সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে এবং এ রোগে ৩৮টির বেশি শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। এ প্রেক্ষাপটে অভিভাবকদের সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন ইউনিসেফের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

হাম কী?

হাম বিশ্বের সবচেয়ে সংক্রামক রোগগুলোর একটি। এটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা প্রথমে নাক, গলা ও ফুসফুসকে (শ্বাসতন্ত্র) সংক্রমিত করে, পরে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। উপসর্গের মধ্যে রয়েছে উচ্চ জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং সারা শরীরে দাগযুক্ত ফুসকুড়ি।

হাম শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাও দুর্বল করে দেয়, ফলে অন্যান্য রোগের ঝুঁকি বাড়ে। এ থেকে নিউমোনিয়া, শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত ও স্নায়ুবিক জটিলতা, ডায়রিয়া, বধিরতা, অন্ধত্ব এবং মস্তিষ্কে প্রদাহ (এনসেফালাইটিস)-এর মতো গুরুতর অসুস্থতা হতে পারে, যা প্রাণঘাতীও হতে পারে। যেকোনো বয়সের মানুষ হামে আক্রান্ত হতে পারেন, তবে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে এটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।

কীভাবে ছড়ায়?

আক্রান্ত ব্যক্তি শ্বাস নিলে, কাশি দিলে বা হাঁচি দিলে হাম সহজেই ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্ত ব্যক্তির লালা, শ্লেষ্মা বা কফের মাধ্যমে ভাইরাসটি ছড়াতে পারে এবং বাতাসে ও বিভিন্ন বস্তুর পৃষ্ঠে প্রায় দুই ঘণ্টা পর্যন্ত টিকে থাকে। দূষিত বাতাসে শ্বাস নিলে, কিংবা দূষিত কিছু স্পর্শ করে চোখ, নাক বা মুখে হাত দিলে সংক্রমণ হতে পারে।

ইউনিসেফের বিশেষজ্ঞরা জানান, কোভিড-১৯ ও জলবসন্তের তুলনায় হাম প্রায় দ্বিগুণ দ্রুত ছড়ায়। হামে আক্রান্ত কোনো শিশু শ্রেণিকক্ষে ঢুকলে সেখানে টিকা না নেওয়া প্রায় সব শিশুই সংক্রমিত হতে পারে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ফুসকুড়ি দেখা দেওয়ার আগেই আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে অন্যদের মধ্যে ভাইরাস ছড়াতে পারে। ফলে অভিভাবকরা বুঝে ওঠার আগেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে।

উপসর্গ ও ফুসকুড়ির ধরন

সাধারণত সংক্রমণের ১০ থেকে ১৪ দিন পর উপসর্গ দেখা দেয়। প্রাথমিক লক্ষণগুলো অস্পষ্ট হওয়ায় অন্য রোগ বলে ভুল হতে পারে। এই লক্ষণগুলো সাধারণত ৪ থেকে ৭ দিন স্থায়ী হয়। এগুলো হলো উচ্চ জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া ও পানি পড়া এবং গালের ভেতরে ছোট ছোট সাদা দাগ (কপলিক স্পট)।

ফুসকুড়ি সাধারণত সংক্রমণের ৭ থেকে ১৮ দিনের মধ্যে দেখা যায়। লাল রঙের দানাদার এই ফুসকুড়ি মুখ ও গলা থেকে শুরু হয়ে প্রায় তিন দিনের মধ্যে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণত ৫ থেকে ৬ দিন পর মিলিয়ে যায়। এটি সাধারণত চুলকায় না। ফর্সা ত্বকে ফুসকুড়ি লাল বা বাদামি দেখায়, আর গাঢ় বা শ্যামবর্ণ ত্বকে তুলনামূলক কম স্পষ্ট হতে পারে।

শিশুদের জন্য কতটা বিপজ্জনক?

হাম অনেকের ধারণার চেয়েও বেশি বিপজ্জনক। হামে মৃত্যুর বেশির ভাগ ঘটনাই রোগটি থেকে সৃষ্ট জটিলতার কারণে ঘটে। সম্ভাব্য জটিলতার মধ্যে রয়েছে দৃষ্টিহীনতা, এনসেফালাইটিস, তীব্র ডায়রিয়া ও পানিশূন্যতা, কানের সংক্রমণ বা বধিরতা এবং নিউমোনিয়াসহ গুরুতর শ্বাসকষ্ট। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু এবং ৩০ বছরের বেশি বয়সী টিকা না নেওয়া প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি।

অপুষ্টিতে ভোগা শিশু, বিশেষ করে যাদের শরীরে পর্যাপ্ত ভিটামিন এ নেই কিংবা এইচআইভি বা অন্য রোগের কারণে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল, তাদের জটিলতার ঝুঁকি আরও বেশি। হাম শিশুর রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে এমনভাবে দুর্বল করে দিতে পারে যে শরীর সংক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষা করার কৌশলই যেন ‘ভুলে যায়’।

প্রতিরোধের সর্বোত্তম উপায় টিকা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য। টিকা দেওয়াই শিশুকে সংক্রমিত হওয়া এবং অন্যদের মধ্যে রোগ ছড়ানো থেকে রক্ষার সর্বোত্তম উপায়। হামের টিকা নিরাপদ ও কার্যকর এবং বাংলাদেশে নিয়মিত টিকাদানের অংশ হিসেবে দেওয়া হয়।

শিশুকে শুধু হামের টিকা অথবা মাম্পস ও রুবেলার সঙ্গে মিলিয়ে হাম-রুবেলা (এমআর) টিকা দেওয়া যায়। পূর্ণ সুরক্ষার জন্য এই টিকার দুটি ডোজ দিতে হয়, যা অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রে সারা জীবনের জন্য সুরক্ষা দেয়।

যেসব দেশে হামের প্রকোপ বেশি, সেখানে সাধারণত ৯ মাস বয়সে প্রথম ডোজ দেওয়া হয়। যেসব দেশে হাম তেমন দেখা যায় না, সেখানে ১২ থেকে ১৫ মাস বয়সে প্রথম ডোজ দেওয়া হয়। দ্বিতীয় ডোজ সাধারণত ১৫ থেকে ২৪ মাস বয়সে দিতে হয়। শিশুকে কখন টিকা দিতে হবে, তা জানতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অথবা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের হালনাগাদ জাতীয় টিকাদান সূচি দেখে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

লক্ষণ দেখা দিলে করণীয়

শিশুর জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া ও চোখ লাল হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিতে হবে। জটিলতা এড়াতে এবং অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ রোধে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার আগে পর্যন্ত শিশুকে বাড়ির অসুস্থ নয় এমন সদস্যদের থেকে আলাদা রাখতে হবে।

হামের নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ নেই। উপসর্গ উপশমে চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং শিশুর শরীর নিজেই সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করে।

বাড়িতে যত্ন

চিকিৎসক বাড়িতে রেখে চিকিৎসার পরামর্শ দিলে শিশুকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও ঘুমের সুযোগ দিতে হবে এবং বেশি করে পানি বা তরল পান করাতে হবে। ডায়রিয়া বা বমির কারণে তরল কমে গেলে খাবার স্যালাইন (ওআরএস) ব্যবহার করা যেতে পারে। নিউমোনিয়া বা চোখের সংক্রমণের ওষুধ দেওয়া হলে তা সঠিকভাবে খাওয়াতে হবে। বুকের দুধ খাওয়ানো অব্যাহত রাখা এবং পুষ্টিকর খাবার দেওয়াও জরুরি। শিশু অপুষ্টিতে ভুগলে স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে চিকিৎসা করাতে হবে। উপসর্গ খারাপের দিকে গেলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) হামে আক্রান্ত সব শিশুকে ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ভিটামিন এ-এর দুটি ডোজ দেওয়ার সুপারিশ করে, যা চিকিৎসক দেবেন। ভিটামিন এ চোখের ক্ষতি, দৃষ্টিহীনতা ও মৃত্যুর ঝুঁকি কমায় এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। বিশেষ করে দুই বছরের কম বয়সী শিশু এবং অপুষ্টির হার বেশি এমন এলাকায় এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তথ্যসূত্র: ইউনিসেফ বাংলাদেশ

ত/জু

ফেসবুকে যুক্ত থাকুন