পশ্চিম সুন্দরবনের খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জে গত দুই মাসে বন অপরাধবিরোধী ১০৮টি অভিযানে ৪৬ জনকে আটক এবং বিপুল পরিমাণ অবৈধ শিকারি সরঞ্জাম জব্দ করেছে বন বিভাগ।
সুন্দরবনে গত জুন ও জুলাই মাসে পশ্চিম বন বিভাগের খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জে বন অপরাধবিরোধী ১০৮টি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেছে বন বিভাগ। দুই মাসের ব্যবধানে সংঘটিত বিভিন্ন বন অপরাধের দায়ে মোট ৪৬ জনকে আটক করা হয়েছে। মামলা হয়েছে ৮৯টি।
বিপুল পরিমান আলামত জব্দ হয়েছে। ৩০ কেজি হরিণের মাংস, দেড় হাজার মিটার হরিণ ধরার মালা ফাঁদ, ৮৯টি নৌকা এবং তিনটি ট্রলার। আরো রয়েছে ১ হাজার ২০০ কেজি কাঁকড়া, ৬১০ কেজি চিংড়ি, ১৮৫ কেজি সাদা মাছ, ৪৭ বোতল বিষ এবং ৫৩টি মাছ ধরার জাল রয়েছে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দায়ের করা ৮৯টি মামলার মধ্যে ১৯টি পিওআর, ৬৯টি ইউডিওআর এবং একটি সিওআর মামলা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। মূলত বন এলাকায় অবৈধ প্রবেশ, বিষ প্রয়োগ করে মৎস্য শিকার এবং বন্যপ্রাণী নিধনের মতো গুরুতর অপরাধের বিরুদ্ধে মূলত এই সাঁড়াশি অভিযান।
অভিযানে উদ্ধার হওয়া উপকরণের ধরন বিশ্লেষণ করলে সুন্দরবনের অভ্যন্তরে অপরাধীদের তৎপরতার একটি স্পষ্ট চিত্র ফুটে ওঠে। জব্দকৃত উপকরণের মধ্যে যা প্রমাণ করে যে স্থানীয় একটি চক্র বনের প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণে আইন অমান্য করে নিয়মিত বিষ প্রয়োগ ও নিষিদ্ধ পদ্ধতি ব্যবহার করছে।
পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বন অপরাধের সংখ্যা কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও অপরাধের ধরন ও সরঞ্জাম উদ্ধারের হার উদ্বেগজনক। গত বছর ১১০টি অভিযানে ৪৭ জনকে আটক এবং ৮২টি মামলা করা হয়েছিল।
এ প্রসঙ্গে পশ্চিম সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এজেডএম হাছানুর রহমান দাবি করেছেন, নিয়মিত টহল ও অভিযানের ফলে সামগ্রিকভাবে বন অপরাধের হার হ্রাস পাচ্ছে। তিনি জানান, সুন্দরবনে অবৈধ প্রবেশ ও বন্যপ্রাণী শিকার রোধে বনরক্ষীরা তাদের সর্বোচ্চ সক্ষমতা দিয়ে কাজ করছেন।
তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, অপরাধীদের নেটওয়ার্ক ভাঙতে এবং স্থানীয় পর্যায়ে তাদের উৎসমূল চিহ্নিত করতে আরও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত টহলের কথা বলা হলেও, বনের বিশাল আয়তন এবং জনবল সংকটের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই অপরাধীদের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না বলে প্রতীয়মান হয়।
সুন্দরবনের সুরক্ষায় এই আইনি পদক্ষেপগুলো কেবল সাময়িক প্রতিকার নয়, বরং অদূর ভবিষ্যতে বনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন একটি স্থায়ী প্রশাসনিক মডেল।
বন অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং জব্দকৃত সরঞ্জামের পরিমাণ বিশ্লেষণ করে বোঝা যায়, সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় বন বিভাগকে আরও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
বনের অভ্যন্তরে অবৈধ প্রবেশ ও বিষ প্রয়োগের মতো ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকলে তা সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের জন্য অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও পেশাগত নিরাপত্তার পাশাপাশি বনজ সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হলে প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় সচেতনতা ও কঠোর আইন প্রয়োগের কোনো বিকল্প নেই।
ম.ম.রবি ডাকুয়া, বাগেরহাট



