বিশ্বব্যাপী উন্নয়ন সহায়তা দ্রুত কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের প্রায় ২ হাজার ২০০ ছোট ও মাঝারি বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) গুরুতর আর্থিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক নতুন গবেষণায় এই চিত্র উঠে এসেছে।
মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিআইডিএস মিলনায়তনে “বিদেশ-নির্ভরতা পেরিয়ে: বাংলাদেশে এনজিও অর্থায়নের ভবিষ্যৎ” শীর্ষক গবেষণার ফল উপস্থাপন করা হয়। প্রতিষ্ঠানের গবেষণা পরিচালক কাজী ইকবাল গবেষণার মূল দিকগুলো তুলে ধরেন।
গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ধনী দেশগুলোর উন্নয়ন সহায়তা প্রকৃত মূল্যে ২৩ শতাংশ কমেছে, যা এক বছরে সবচেয়ে বড় পতন। যুক্তরাষ্ট্র তাদের সহায়তা সংস্থা ইউএসএআইডির কার্যক্রম বন্ধ করেছে। আর যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও ফ্রান্স আগামী কয়েক বছরের জন্য সহায়তার বাজেট ছেঁটে প্রতিরক্ষা খাতে অর্থ সরিয়েছে। ফলে এই তহবিল নিকট ভবিষ্যতে ফিরে আসার সম্ভাবনা কম বলে মনে করা হচ্ছে।
গবেষকদের মতে, এই ধাক্কার পূর্ণ প্রভাব বাংলাদেশে এখনো পড়েনি, কারণ আগে অনুমোদিত প্রকল্পের অর্থ এখনো ছাড় হচ্ছে। তবে নতুন প্রকল্পের অনুমোদনে পতন স্পষ্ট। ২০২১-২২ অর্থবছরে যেখানে ২ হাজার ৬১টি প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছিল, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে ১ হাজার ৬৫৪টিতে।
সবচেয়ে বিপাকে পড়েছে সেসব ছোট ও মাঝারি এনজিও, যাদের ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম নেই এবং যারা প্রায় পুরোপুরি অনুদানের ওপর চলে। শুধু বিদেশি অনুদানের ওপর নির্ভরশীল সংস্থাগুলোর বাজেট গড়ে ৪০ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম থাকা সংস্থাগুলোর ক্ষেত্রে এই কমতি ১২ শতাংশ। এনজিও বিষয়ক ব্যুরো ও মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির তথ্য বিশ্লেষণ এবং ৪৬টি এনজিওর ওপর জরিপের ভিত্তিতে গবেষণাটি তৈরি হয়েছে।
সংকট মোকাবিলায় গবেষণায় বেশ কিছু পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সরকারি ক্রয়, সিএসআর ও অন্যান্য তহবিলে ব্যবহারের জন্য যোগ্য এনজিওর একটি উন্মুক্ত তালিকা তৈরি এবং ক্রয় বিধিমালায় এনজিও-সংক্রান্ত বিধান কার্যকরে নির্দেশিকা প্রণয়ন। পাশাপাশি এনজিও ফাউন্ডেশন ও পিকেএসএফের মাধ্যমে ছোট ও মাঝারি এনজিওর জন্য আলাদা তহবিল গঠন, খসড়া সিএসআর নীতিতে যোগ্য বাস্তবায়নকারী সংস্থা ও অব্যয়িত অর্থ-সংক্রান্ত বিধান যুক্ত করা এবং সামাজিক ব্যবসাকে আইনি স্বীকৃতি ও কর সুবিধা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিদেশি অনুদানের ওপর নির্ভরতা কমানোর তাগিদ দেন। তাঁর মতে, সরকারি নানা কর্মসূচিতে এনজিওর অংশগ্রহণ বাড়ালে একদিকে তাদের আয়ের বিকল্প পথ তৈরি হবে, অন্যদিকে উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যাবে।
মন্ত্রী বলেন, মানব উন্নয়ন, স্থানীয় সংস্কৃতি সংরক্ষণ ও বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ নিয়ে একটি সমন্বিত কাঠামো প্রয়োজন। সৃজনশীল অর্থনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এনজিওগুলো ইতোমধ্যে কাজ করছে; এই অংশীদারিত্বকে প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতিগত রূপ দিতে হবে। প্রান্তিক মানুষের কাছে সরকারি সেবা পৌঁছে দিতে এনজিওর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেও তিনি উল্লেখ করেন। শীতলপাটির মতো ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এসব পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাতে আধুনিক নকশা, মূল্য সংযোজন ও বিপণনে জোর দেওয়া দরকার।
প্রকল্প অনুমোদনে চারটি শর্ত নিশ্চিত করার কথাও জানান মন্ত্রী: অর্থের যথাযথ মূল্য (ভ্যালু ফর মানি), বিনিয়োগের বিপরীতে প্রাপ্তি, কর্মসংস্থান বা উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং পরিবেশগত সুরক্ষা। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এই চার শর্ত পূরণ না হলে কোনো প্রকল্প অনুমোদন পাবে না।
অনুষ্ঠানে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি এবং পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতার উপস্থিত ছিলেন।
ত/জু



