একটি শিশুকে বাঁচাতে একজোট ছয় প্রতিষ্ঠান

অতি তীব্র অপুষ্টি, নিউমোনিয়া ও যক্ষ্মার মতো একসঙ্গে একাধিক মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়া ১১ মাস বয়সী শিশু আজিফা জান্নাতের জীবন রক্ষায় একজোট হয়েছে সরকারি স্বাস্থ্য ও সমাজসেবা বিভাগ এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা। সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার দরগাপাশা ইউনিয়নের সিদখাই গ্রামের এই শিশুটি এখন চিকিৎসা ও পরিচর্যার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে সুস্থতার পথে।

সিদখাই গ্রামের দিনমজুর পরিবারে অভাব নিত্যসঙ্গী। এই সংসারেই জন্ম আজিফার, বাবা নজরুল ইসলাম ও মা সাবানা বেগমের সন্তান সে। পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার না পাওয়ায় ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে শিশুটি। ১১ মাস বয়সে তার ওজন নেমে আসে মাত্র ৪ দশমিক ১ কেজিতে, আর হাতের মাঝ-উপরিভাগের বেড় (এমইউএসি) দাঁড়ায় ১০ দশমিক ৫ সেন্টিমিটারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটি ‘অতি তীব্র অপুষ্টি’ (এসএএম)। হাসপাতালের খরচ ও যাতায়াতের অনিশ্চয়তার ভয়ে পরিবারটি চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার সাহস পাচ্ছিল না।

জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের (আইপিএইচএন) নির্দেশনায় এবং এলডিএস চ্যারিটিজের সহায়তায় পরিচালিত ‘মেইন’ (মাল্টিসেক্টরাল অ্যালায়েন্স ফর ইমপ্রুভড নিউট্রিশন) প্রকল্পের মাধ্যমে আজিফার খোঁজ পান দি হাঙ্গার প্রজেক্টের পুষ্টি উজ্জীবক হাবিবা আক্তার। শিশুটির অবস্থা দেখে বিলম্ব না করে পরিবারটিকে বুঝিয়ে ১৯ সেপ্টেম্বর তাকে স্থানীয় কমিউনিটি ক্লিনিকে নিয়ে যান তিনি। সেখান থেকে শিশুটিকে উপজেলা হাসপাতালে রেফার করা হয় এবং ২২ সেপ্টেম্বর ভর্তি করা হয়।

আইপিএইচএনের প্রটোকল অনুযায়ী হাসপাতালে ভর্তির পর চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে থেরাপিউটিক মিল্ক এফ-৭৫ ও এফ-১০০ দিয়ে শিশুটির পুষ্টি পুনর্বাসন শুরু হয়। আর্থিক অসামর্থ্যের কারণে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো যাচ্ছিল না। তখন কেয়ার বাংলাদেশ জরুরি আর্থিক সহায়তা দিয়ে পরীক্ষাগুলো সম্পন্ন করায়। ভর্তির প্রথম দিন হাসপাতাল থেকে খাবার বরাদ্দ পেতে দেরি হলে দি হাঙ্গার প্রজেক্ট মা ও শিশুর জন্য তাৎক্ষণিকভাবে খাবারের ব্যবস্থা করে। পরিবারটির অসহায় অবস্থা দেখে উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় ওষুধ কেনার জন্য ২ হাজার টাকা সহায়তা দেয়।

চিকিৎসার মধ্যেই আজিফার ফুসফুসে মারাত্মক নিউমোনিয়া ধরা পড়ে, পরে শনাক্ত হয় যক্ষ্মা। অতি তীব্র অপুষ্টিতে ভোগা শিশুর জন্য এ দুটি রোগ একসঙ্গে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সরকারি চিকিৎসকদের চিকিৎসা, সমাজসেবা বিভাগ ও প্রকল্পের সহায়তায় নিউমোনিয়া থেকে সে সেরে ওঠে। যক্ষ্মার উন্নত চিকিৎসার জন্য গত ২ অক্টোবর তাকে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে রেফার করা হয়।

দীর্ঘ সময়ের মানসিক ক্লান্তি ও ভয়ের কারণে পরিবারটি আজিফাকে নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে। তবে প্রকল্পের কার্যক্রম থেমে নেই। পুষ্টি উজ্জীবক নিয়মিত তাদের বাড়িতে গিয়ে মায়ের সঙ্গে কথা বলছেন এবং পরিবারের ভয় কাটাতে কাউন্সেলিং করছেন। লক্ষ্য, শিশুটিকে সদর হাসপাতালে নিয়ে যক্ষ্মার পূর্ণ চিকিৎসা সম্পন্ন করানো।

‘মেইন’ প্রকল্পে এলডিএস চ্যারিটিজ কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে। সরকারের পক্ষে তত্ত্বাবধান ও সমন্বয় করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আইপিএইচএন। বাস্তবায়নকারী কনসোর্টিয়ামে রয়েছে কেয়ার বাংলাদেশ, আইডিই, হারভেস্টপ্লাস সলিউশনস এবং দি হাঙ্গার প্রজেক্ট বাংলাদেশ। প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আজিফার ঘটনা দেখিয়েছে, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করলে মাঠপর্যায়ে অপুষ্টির ঝুঁকিতে থাকা শিশুকে চিহ্নিত করে ক্লিনিক ও হাসপাতাল হয়ে বাড়িতে ফেরা পর্যন্ত নিবিড় পরিচর্যা নিশ্চিত করা সম্ভব।

ত/জু

ফেসবুকে যুক্ত থাকুন