২৪তম প্রয়াণ দিবসে তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী, বাংলার কৃষকের ‘রানীমা’ নামে খ্যাত ইলা মিত্রকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। ২০০২ সালের ১৩ অক্টোবর ৭৭ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন শোষিত ও বঞ্চিত কৃষকের অধিকার আদায়ের এই সংগ্রামী নেত্রী।
ইলা মিত্র ১৯২৫ সালের ১৮ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন। কলকাতার বেথুন স্কুল ও কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি নেওয়ার পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ও সংস্কৃতে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলাতেও পারদর্শী ছিলেন; বিশেষ করে সাঁতার, ব্যাডমিন্টন ও বাস্কেটবলে। ১৯৩৫ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত তিনি রাজ্য জুনিয়র অ্যাথলেটিক চ্যাম্পিয়ন ছিলেন।
নারী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনীতিতে প্রবেশ। ১৯৪৩ সালে তিনি কলকাতা মহিলা সমিতির সদস্য হন। এ সময় হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি গঠনের মাধ্যমে নারী আন্দোলনকে জোরদার করেন।
১৯৪৫ সালে বিয়ের পর তিনি মালদহে চলে আসেন। রক্ষণশীল জমিদার পরিবারের কঠোর প্রথা থেকে বেরিয়ে এসে সমাজসেবায় আত্মনিয়োগ করেন এবং এলাকার ‘রানীমা’ হয়ে ওঠেন। জমিদারদের হাতে কৃষকের বঞ্চনা তাঁকে আহত করে এবং এই শোষণের বিরুদ্ধে তিনি তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলতে ব্রতী হন। ১৯৪৬ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত তিনি রাজশাহীর চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকায় তেভাগা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।
আন্দোলন একসময় ভয়াবহ রূপ নেয়। ১৯৫০ সালের ৫ জানুয়ারি নাচোলে পুলিশ ও কৃষকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এর জের ধরে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের সেনারা এলাকায় ব্যাপক গুলি ও মারধর চালায়। এতে শতাধিক মানুষ নিহত হন এবং অনেক গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এলাকার অধিবাসীদের বেশির ভাগ ছিলেন সাঁওতাল। প্রাণভয়ে মানুষ এলাকা ছেড়ে পালালে ইলা মিত্রও পুরুষের পোশাকে পালিয়ে যান। তবে একপর্যায়ে রহনপুর থেকে একশ জন অনুসারীসহ গোয়েন্দা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন তিনি।
নাচোল থানায় তাঁর ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। পরে তাঁকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ হাসপাতালে নেওয়া হয়। ২১ জানুয়ারি দেশদ্রোহিতার অভিযোগে তাঁকে রাজশাহী কারাগারে পাঠানো হয়, যেখানে নির্যাতনের দ্বিতীয় ধাপ শুরু হয়। এরপর তাঁকে ঢাকা কারাগারে নেওয়া হয়। মুমূর্ষু অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হলে রাজনীতিবিদ, ছাত্রছাত্রী, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের শত শত প্রতিনিধি তাঁকে দেখতে ছুটে যান। শেষ পর্যন্ত সরকার তাঁকে প্যারোলে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় এবং কলকাতায় যাওয়ার অনুমতি দেয়।
স্বাধীন বাংলাদেশে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রথম সম্মেলনে তিনি প্রথম অতিথি হিসেবে আসেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধেও তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। কর্মজীবনে তিনি কলকাতার সিটি কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে অবসর নেন। রাজনীতির পাশাপাশি সাহিত্যচর্চায়ও তাঁর অবদান ছিল। সমাজসেবা ও সমাজ সংস্কারে অবদানের জন্য তিনি বহু পুরস্কারে ভূষিত হন।
প্রয়াণ দিবসে নির্যাতিত, বঞ্চিত ও মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের এই কিংবদন্তি নেত্রীকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ।
ত/জু



