বান্দরবানের প্রত্যন্ত পাহাড়ে সমবায়ের নেতৃত্বে খেয়াং নারী কৃষক; দর-কষাকষির সক্ষমতায় কাজুবাদামের দাম বেড়েছে প্রায় আড়াই গুণ।
বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্কবিহীন বান্দরবানের এক প্রত্যন্ত পাহাড়ি জনপদে কাজুবাদাম চাষ করে নিজের ও সম্প্রদায়ের জীবন বদলে দিচ্ছেন ৫৭ বছর বয়সী পুতুলি খেয়াং। খেয়াং আদিবাসী সম্প্রদায়ের এই নারী কৃষক এখন স্থানীয় কাজুবাদাম চাষিদের সমবায়ের সভাপতি। প্রশিক্ষণ ও সমবায়ের মাধ্যমে তিনি শুধু নিজের আয়ই বাড়াননি, অন্য কৃষকদের, বিশেষ করে নারীদেরও এগিয়ে নিতে কাজ করছেন।
২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই জমিতে চাষ করছেন পুতুলি। এখন তিনি প্রায় চার একর জমিতে কাজু, কলা ও আম চাষ করেন। কৃষিই তাঁর আয়ের প্রধান উৎস।
পুতুলি বলেন, অনেক বছর ধরে এ এলাকার কৃষকরা আলাদা আলাদাভাবে চাষ করতেন। তিনি মূলত অনানুষ্ঠানিক ক্রেতাদের কাছে কাজু বিক্রি করতেন। বাজারদর সম্পর্কে তাঁর তথ্য ছিল খুব কম, দর-কষাকষির সুযোগও ছিল না। ক্রেতারা যে দাম বলতেন, সেটাই মেনে নিতে হতো। তাঁর ভাষ্য, “আমরা কাজু উৎপাদন করতাম, কিন্তু উৎপাদনের পর কী হবে, তার ওপর আমাদের তেমন নিয়ন্ত্রণ ছিল না। যে কাজুবাদাম আমি ফলাতাম, তা কখনো নিজে চেখেও দেখিনি।”
পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে। ‘তাজিংডং’ নামের একটি সংগঠন তাঁদের এলাকায় গিয়ে কাজুচাষিদের একত্র করে একটি সমবায় গঠন করে। পুতুলি কাজুগাছের পরিচর্যা, বাদাম প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাত করার প্রশিক্ষণ পান। এ ছাড়া সমবায় ব্যবস্থাপনা ও ক্রেতাদের সঙ্গে দর-কষাকষির বিষয়েও শেখেন।
তিনি বলেন, আগে তিনি অন্য কৃষকদের দেখে চাষ করতেন। এখন কোন পদ্ধতি কেন ও কীভাবে কাজ করে, তা বোঝেন এবং নিজের চাষ নিজেই পরিকল্পনা করতে পারেন। এতে ফসলের মান ও পরিমাণ দুটোই বেড়েছে।
সহকৃষকরা তাঁকে সমবায়ের সভাপতি নির্বাচিত করলে তিনি গর্ব অনুভব করেন, একই সঙ্গে বড় দায়িত্বও টের পান। পুতুলির কাছে নেতৃত্ব মানে শুধু পদ নয়, বরং কথা বলার, দর-কষাকষি করার এবং অন্য কৃষকদের নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার আত্মবিশ্বাস।
তিনি বলেন, “আগে আমি মূলত নিজের খামার নিয়েই ভাবতাম। এখন আমি সমবায়ের অন্য সদস্যদের, বিশেষ করে নারীদের বোঝাতে চাই যে আমরা একসঙ্গে কাজ করতে পারি, নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরা নিতে পারি এবং বাজারে আমাদের কণ্ঠস্বর আরও জোরালো করতে পারি।”
তাঁর মতে, এই সম্প্রদায়ের অনেক নারীর প্রশিক্ষণ, বাজার ও আয়ের সুযোগ সীমিত ছিল। কাজুচাষ ও সমবায়ে অংশ নিয়ে নারীরা আয় বাড়াতে, আত্মবিশ্বাস গড়তে এবং পরিবার ও সমাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণে বড় ভূমিকা রাখতে পারবেন বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
আগে স্থানীয় ক্রেতাদের ওপর নির্ভর করতে হতো। এখন বড় ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি হয়েছে। পুতুলি বলেন, “আমরা এখন আমাদের উৎপাদিত পণ্যের মূল্য বুঝি এবং কোথায় ও কীভাবে বিক্রি করব, সে বিষয়ে আমাদের বেছে নেওয়ার সুযোগ বেড়েছে।”
২০২৫ সালে তিনি প্রায় ৭২০ কেজি কাজুবাদাম সংগ্রহ করেন। প্রতি ৪০ কেজির জন্য পান প্রায় ৬ হাজার ৫০০ টাকা (প্রায় ৫৪ মার্কিন ডলার), যেখানে আগে পেতেন প্রায় ২ হাজার ৫০০ টাকা (প্রায় ২১ ডলার)। সেই বছর কাজু থেকে তাঁর আয় হয় প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার টাকা (প্রায় ৯৫৯ ডলার)। মৌসুমে কাজুই তাঁর আয়ের প্রধান উৎস। এর পাশাপাশি তিনি কলা ও আমও চাষ করেন।
তবে জীবন এখনো কঠিন। গ্রামে বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই, পানীয় জলেরও সংকট আছে। যোগাযোগব্যবস্থাও দুর্বল, ফলে বাজারে পৌঁছানো ও ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা কঠিন। পুতুলি জানান, কখনো কখনো বাজারে যেতে মোটরবাইকে প্রায় ১০ কিলোমিটার পাড়ি দিতে হয়। বাজারের সঙ্গে আরও ভালো সংযোগ ও অবকাঠামো প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
পুতুলির এই অর্জন তাঁর পরিবারকেও অনুপ্রাণিত করেছে। তিনি বলেন, এটি শুধু আয়ের বিষয় নয়, বরং মর্যাদা, আত্মবিশ্বাস এবং এমন কিছু গড়ে তোলার বিষয়, যার সুফল তাঁর সন্তানরা ভবিষ্যতে পাবে।
ত/জু



